রক্ত কি?

ð রক্ত হল উচ্চশ্রেণীর প্রাণিদেহের এক প্রকার কোষবহুলবহু জৈব  অজৈব পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত সামান্য লবণাক্তআঠালোক্ষারধর্মী  লালবর্ণের ঘন তরল পদার্থ যা হৃৎপিন্ডধমনীশিরা  কৈশিক জালিকার মধ্য দিয়ে নিয়মিত প্রবাহিত হয় রক্ত একধরনের তরল যোজক কলা রক্ত প্রধানত দেহে অক্সিজেনকার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ পরিবাহিত করে রক্ত হল আমাদেরে দেহের জ্বালানি স্বরূপ মানবদেহে শতকরা  ভাগ রক্ত থাকে (গড়ে মানবদেহে - লিটার রক্ত থাকে) রক্তের PH সামান্য ক্ষারীয় অর্থাৎ . - . মানুষের রক্তের তাপমাত্রা ৩৬ - ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (গড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)

রক্তের উপাদান কি কি?

ðরক্তের মূল অংশ বা উপাদান দুইটি। যথা:

1.    রক্তরস (Blood Plasma): রক্তের তরলহালকা হলুদাভ অংশকে রক্তরস (plasma) বলে রক্তকণিকা ব্যতীত রক্তের বাকি অংশই রক্ত রস মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্তের প্রায় ৫৫রক্তরস

2.    রক্তকণিকা (Blood corpuscle): রক্তের প্লাজমার মধ্যে নির্দিষ্ট আকার  গঠন বিশিষ্ট উপাদান বা রক্ত কোষসমূহকে রক্ত কণিকা বলে

রক্তে প্রায় তিন ধরনের কণিকা পাওয়া যায়। যথা:


Ø লোহিত রক্তকণিকা (Erythorcytes) : লোহিত রক্তকণিকা রক্তের সর্বপ্রধান কোষ বা কণিকা যা মেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহের কলাগুলিতে অক্সিজেন সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে লোহিত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম হিমোগ্লোবিন নামক এক ধরনের প্রোটিন অণুতে পূর্ণ থাকে

Ø শ্বেত রক্তকণিকা (Leucocytes) : মানবদেহের রক্তে বর্নহীন,নিউক্লিয়াসযুক্ত এবং তুলনামূলকভাবে স্বল্পসংখ্যক ও বৃহদাকার যে কোষ দেখা যায় এবং যারা দেহকে সংক্রমন থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে তাকে শ্বেত রক্তকণিকা বলে। প্রতি ঘন মিলিলিটার রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা প্রায় ৫০০০-৯০০০। লোহিত রক্তকণিকার তুলনায় শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা অনেক কম হয়। লোহিত রক্তকণিকা ও শ্বেত রক্তকণিকার অনুপাত প্রায় ৭০০:১।

Ø অণুচক্রিকা (Thrombocytes) : নিউক্লিয়াসবিহীনগোলাকার বা ডিম্বাকার বা রড্ আকৃতির বর্ণহীন সাইটোপ্লাজমীয় চাকতি বিশিষ্ট রক্তের ক্ষুদ্রতম কোষকে অণুচক্রিকা বলে

হিমোগ্লোবিন কি?

ð হিমোগ্লোবিন একটি অক্সিজেনবাহী লৌহসমৃদ্ধ মেটালোপ্রোটিন যা মেরুদণ্ডী প্রাণিদের লোহিত কণিকা এবং কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণির কলায় পাওয়া যায় স্তন্যপায়ী প্রাণিদের ক্ষেত্রে লোহিত কণিকার শুষ্ক ওজনের ৯৬-৯৭% হয় হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশএবং পানিসহ মোট ওজনের তা ৩৫% হিমোগ্লোবিন ফুসফুস হতে অক্সিজেন দেহের বাকি অংশে নিয়ে যায় এবং কোষীয় ব্যবহারের জন্য অবমুক্ত করে এটি অন্যান্য গ্যাস পরিবহনেও অবদান রাখেযেমন এটি কোষকলা হতে CO2 পরিবহন করে ফুসফুসে নিয়ে যায় প্রতি গ্রাম হিমোগ্লোবিন .৩৬ হতে .৩৭ মিলিলিটার অক্সিজেন ধারণ করতে পারেযা রক্তের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা ৭০গুণ বাড়িয়ে দেয়

প্লাজমা কি?

ð  প্লাজমা বা রক্তরস হল রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি হালকা হলুদাভ তরল যা সাধারণত দেহের বিভিন্ন প্রকার রক্তকোষ ধারণ করে মানব দেহের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগই হল রক্তরস রক্তরস মূলত কোষপর্দার বাইরের রক্তগহ্বরের মধ্যকার তরল পদার্থ এর ৯৫ শতাংশ হল জল এবং -শতাংশ বিভিন্নপ্রকার প্রোটিন (অ্যালবুমিনগ্লোবুলিনফাইব্রিনোজেন), গ্লুকোজক্লোটিং উপাদানইলেক্টোপ্লেট (Na+, Ca2+, Mg2+, HCO3-, Cl-, ইত্যাদি), হরমোন এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড (রক্তরস বিপাকীয় সংবহনতন্ত্রের মূল মাধ্যম) রক্তরস মানবদেহের আমিষ সংরক্ষণের কাজও করে থাকে এটি রক্তগহ্বরের অভিস্রবণ প্রক্রিয়া অটুট রাখে যাতে রক্তে বিভিন্ন ইলেক্ট্রোলাইট যথানুপাতে বিদ্যমান থাকে এবং মানবদেহ জীবাণু সংক্রমণ  বিবিধ রক্তবৈকল্য থেকে মুক্ত থাকে রক্তরসকে তৈরি করা হয় সেন্ট্রিফিউজে অ্যান্টিকোগুলেন্টেধারী বিশুদ্ধ রক্তের নলকে স্পিনিং করেযতক্ষণ না রক্তকোষ নলের নিচে পড়ে যায় এরপর রক্তরস অন্য একটি পাত্রে ঢেলে পৃথক করা হয় রক্তরসের ঘনত্ব প্রায় ১০২৫ কেজি/মিটার৩বা .০২৫ গ্রাম/মিলিলিটার রক্ত সিরাম হল ক্লোটিং উপাদান ব্যতীত একধরনের রক্তরসপ্লাজমাফেরেসিস হল একধরনের মেডিকেল থেরাপি যার মধ্যে আছে রক্তরস এক্সট্রেকশনচিকিৎসা এবং রিইনটিগ্রেশন

মানব দেহে রক্তের গুরুত্ব কি?

ð রক্ত শরীরের অভ্যন্তরীণ এক পরিবহন মাধ্যম এটি বাহিত হয় শিরা বা ধমনীর মধ্য দিয়ে দেহের প্রতিটি টিস্যুতে পৌঁছে দেয় খাবার  অক্সিজেন টিস্যুর বৃদ্ধি  ক্ষয়রোধের জন্যে  খাবার  অক্সিজেন অপরিহার্য এছাড়া দেহের বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হরমোন রক্তের মাধ্যমেই পৌঁছে যায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেনিশ্চিত করে  অঙ্গের কর্মক্ষমতাকে রক্ত টিস্যুর বর্জ্যগুলো বের করে দেয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে বয়ে আনে ফুসফুসেদেহের বাইরে বের করে দেয়ার জন্যে বাড়তি উপাদানগুলোকে পরিবহন করে নিয়ে যায় কিডনিতেযাতে দেহের বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে দেহের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে রক্ত সাহায্য করে দেহের অন্যান্য তরল পদার্থগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে যখন দেহ রোগাক্রান্ত হয়তখন রক্তই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে জীবাণুর বিরুদ্ধে দেহের অভ্যন্তরে এসিড এবং ক্ষারের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখাও রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রতি ফোঁটা রক্তে রয়েছে ২৫০ মিলিয়ন বা ২৫ কোটি লোহিতকণিকাচার লাখ শ্বেতকণিকা  ২৫ মিলিয়ন বা আড়াই কোটি প্লাটিলেট  কণিকগুলো অনুজ্জ্বল হলদে রঙের এক তরল প্লাজমার মধ্যে ডুবে থাকে লোহিতকণিকাগুলো ফুসফুস থেকে হৃৎপিণ্ড হয়ে সারা দেহে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায় এবং সারা দেহের কোষ থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে ফিরিয়ে নিয়ে আসে শ্বেতকণিকা দেহ-আক্রমণকারী জীবাণুকে ধ্বংস করে আর জখমস্থানে রক্তকে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে প্লাটিলেট প্লাজমা এসব রক্তকণিকাগুলোকে সারা দেহে বয়ে নিয়ে বেড়ায় পাশাপাশি রাসায়নিক পদার্থ  পুষ্টি সরবরাহ করে দেহের বিভিন্ন অংশে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একজন মানুষের হৃৎপিণ্ড ১২ হাজার মাইল রক্তবাহী শিরা  ধমনীর মধ্য দিয়ে আট হাজার গ্যালন রক্ত পাম্প করে হৃৎপিণ্ড সবসময়ই রক্ত পাম্প করছে স্বাভাবিক অবস্থায় পাম্প করা রক্তের শতকরা ১৫ ভাগ সরাসরি চলে যায় মস্তিষ্কে২৫ ভাগ যায় কিডনিতে পেশিগুলোতে যায় ২০ ভাগ হৃৎপিণ্ডের নিজেরও পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ প্রয়োজন হয়

রক্তের গ্রুপ  হারঃ

ð মানুষের রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে রক্তের লোহিতকণায়  রক্তরসে রাসায়নিক উপাদানগত কিছু তারতম্য রক্তের এই শ্রেণি বিভাগের কারণ বিভিন্ন ধরনের রক্তগ্রুপ থাকলেও রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে কেবল ABO গ্রুপ  Rh ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ

ð বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর রক্তের গ্রুপভিত্তিক হারঃ

1.    A= ২২.৪৪%    B= ৩৫.২০%    O= ৩৩.৯৭%    AB= .৩৯%

2.    বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর রক্তের রেসাস ফ্যাক্টর হারঃ

Rhesus Positive = 97.44%    Rhesus Negative = 2.56%

কারা রক্ত দিতে পারবেন?

ð ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো শারীরিক  মানসিকভাবে সুস্থ  সক্ষম ব্যক্তি রক্ত দিতে পারবেন

ð যাদের ওজন ৫০ কেজি বা তার বেশি (কখনো সর্বনিম্ন ওজন ৪৫ কেজিও ধরা হয়)

ð কোনো ব্যক্তি একবার রক্ত দেওয়ার  মাস পর আবার রক্ত দিতে পারবেন

কারা রক্ত দেবেন না?

ð হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম (পুরুষদের ন্যূনতম ১২ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ন্যূনতম ১১ গ্রাম/ডেসিলিটার হতে হবেথাকলে

ð রক্তচাপ  শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক না থাকলে রক্ত দেওয়া ওই মুহূর্তে উচিত নয়

ð শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগযেমন হাঁপানি বা অ্যাজমা

ð রক্তবাহিত রোগ যেমনহেপাটাইটিস বি বা সিজন্ডিসএইডসসিফিলিসগনোরিয়াম্যালেরিয়া ইত্যাদি থাকলে রক্ত দেওয়া যাবে না তা ছাড়া টাইফয়েডডায়াবেটিসচর্মরোগবাতজ্বরহৃদ্রোগ থাকলেও রক্ত দেওয়া উচিত নয়

ð নারীদের মধ্যে যাঁরা অন্তঃসত্ত্বা  যাঁদের ঋতুস্রাব চলছে তাঁরা রক্ত দেবেন নাসন্তান জন্মদানের এক বছরের মধ্যেও না

ð যাঁরা কিছু ওষুধ সেবন করছেনযেমনকেমোথেরাপিহরমোন থেরাপিঅ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি তাঁরা সে সময় রক্ত দেবেন না

ð যাঁদের বিগত  মাসের মধ্যে বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁরা রক্ত দেবেন না

কিভাবে ডোনার খুঁজবেন?

ð প্রথমেইপরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে খোঁজার চেষ্টা করুন

ð এরপরেসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে খুঁজুন তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে খোঁজার ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়গুলো উল্লেখ করবেনঃ

Ø রোগীর নামরোগীর সমস্যারক্তের গ্রুপরক্তের পরিমাণকখন দরকারকোথায় দরকার (হাসপাতালের নাম), যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর

কিভাবে ডোনারের সাথে কথা বলবেন?

ð ডোনারের সাথে প্রথমে কুশল বিনিময় করে নিবেন

ð ডোনারের সাথে কথা বলার সময় ব্যস্ততা দেখাবেন না

ð যে সময়ে রক্ত দরকার সে সময়ে ডোনার ফ্রি থাকবেন কিনা জিজ্ঞেস করে নেবেন

ð যতটা সম্ভব ধীরে কথা বলুন

 

ডোনারের প্রতি আপনার দায়িত্ববোধ কি?

ð ডোনারের যাতায়াতের ব্যবস্থা

ð বিশুদ্ধ পানীডাবস্যালাইনের ব্যাবস্থা

ð রক্তের বিনিময় টাকা অফার না করা

ð আন্তরিক হওয়া এবং পরবর্তী ২৪ ঘন্টা ডোনারের খোঁজ খবর রাখা

ð যে দেশে ২৫০ মিলি গ্রাম পানির বোতল কিনে খেতে হয়সে দেশে বিনা টাকায় ৪৫০ মিলি গ্রাম রক্ত দাতাকে সম্মান করা আপনার কর্তব্য


My Published

  রক্ত   কি ? ð   রক্ত   হল   উচ্চশ্রেণীর   প্রাণিদেহের   এক   প্রকার   কোষবহুল ,  বহু   জৈব   ও   অজৈব   পদার্থের   সমন্বয়ে   গঠিত   সামান...

Most popular blog from all my published...